৭টি উপজেলা নিয়ে গঠিত পুরো বান্দরবানে মাত্র একটি দেওয়ানী আদালত রয়েছে যেখানে মাত্র একজন সিনিয়র সিভিল জজ বসেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে এই আদালত দীর্ঘ ৯ মাস ধরে শূণ্য পড়ে আছে। ফলে হাজার হাজার বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তির শেষ নেই বললেই চলে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিগত ৯ মাস আগে সিনিয়র সিভিল জজ মোহাম্মদ দাউদ হাসান পদোন্নতি জনিত কারনে বদলী হয়ে যায়। কিন্তু তার শূণ্যপদ পূরণ করার জন্য কোন সিনিয়র সিভিল জজ এখনো পদায়ন করা হয়নি। কখন এই শূণ্যপদ পূরণ হবে তাও কারো জানা নেই।
বান্দরবানের দেওয়ানী আইনজীবি হিসেবে পরিচিত অ্যাডভোকেট রাজীব চন্দ্র ধর জানায়, দীর্ঘদিন ধরে সিনিয়র সিভিল জজের পদ শূন্য থাকায় সিভিল বিচারব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে সাধারণ বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। বর্তমানে যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালত, বান্দরবান (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে কিছু সিভিল মামলা শুনানি করলেও, নিজ আদালতের মামলার চাপের কারণে এই অতিরিক্ত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
বান্দরবান জেলা আইনজীবি সমিতির সাধারন সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবু জাফর জানান,
এই আদি এখতিয়ার সম্পন্ন আদালতটিতে জেলার প্রায় নব্বই ভাগ দেওয়ানি মামলা বিচারাধীন। তাছাড়াও, গ্রাম আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল এই আদালতেই দায়ের ও নিষ্পত্তি করা হয়। কিন্তু বিচারক না থাকায় প্রায় সব ধরনের কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে বন্ধ রয়েছে। ফলে জেলার দেওয়ানি বিচার ব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
আদালত এবং একাধিক আইনজীবী সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে এই আদালতে বিপুল সংখ্যক দেওয়ানি মামলা বিচারাধীন থাকলেও বিচারক না থাকায় মামলা ফাইলিং, জরুরি নিষেধাজ্ঞা শুনানি, সাক্ষ্য গ্রহণ, তদন্তসহ সবধরনের কার্যক্রম অচল হয়ে আছে।
বান্দরবান জেলা আইনজীবি সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম জানান, এই পরিস্থিতি বাংলাদেশ সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বর্ণিত আইনের দৃষ্টিতে সমতা, ৩১ অনুচ্ছেদে নিশ্চিতকৃত আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার এবং ৩৫(৩) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত দ্রুত ও ন্যায্য বিচার লাভের অধিকারের পরিপন্থী। একইসাথে এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার (Access to Justice) ও ন্যায্য বিচারের অধিকার (Fair Trial)-এর মৌলিক নীতিরও পরিপন্থী।
তিনি আরো জানান, বিচারপ্রার্থীদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে অযৌক্তিক বিলম্ব ঘটার কারনে ভূমি ও পারিবারিক বিরোধ জটিল আকার ধারণ করছে এবং সামগ্রিকভাবে আইনের শাসনের প্রতি জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। সুতরাং, ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ এবং বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ লাঘবের স্বার্থে সিনিয়র সিভিল জজের শূন্য পদে অবিলম্বে একজন যোগ্য বিচারক পদায়নের জন্য জোর দাবী জানাচ্ছি।
মোহাম্মদ ইলিয়াছ
বান্দরবান প্রতিনিধি
০১৮১২৫৮৫৮৯৮
News : 02
Bandarban-25-4-(2)
দেশের চাক সম্প্রদায়ের সর্বপ্রথম আইনজীবী এম এপ্রু চাক
মোহাম্মদ ইলিয়াছ, বান্দরবান
বাংলাদেশের একমাত্র চাক সম্প্রদায় যারা পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান জেলায় বসবাস করে। তারা মূলত নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বিশেষ করে নাইক্ষ্যংছড়ি সদর, বাইশারী এবং দোছড়ি ইউনিয়নে তাদের প্রধান বসতি দেখা যায়।
তাছাড়াও লামা ও আলীকদম উপজেলায়ও এই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কিছু সংখ্যক চাক পরিবার বসবাস করে। চাকরা তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিতে বেশ সমৃদ্ধ। তারা নিজেদেরকে চাকমা সম্প্রদায় থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি জাতিসত্তা হিসেবে পরিচয় দেয় এবং তাদের ভাষা ও রীতিনীতিও স্বতন্ত্র। তারা মূলত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী।
এই অন্যতম চাক সম্প্রদায়ের থেকে শিক্ষিত হয়ে বিভিন্ন পেশায় অসংখ্য নারী পুরুষ যুক্ত হলেও আইন পেশায় এ পর্যন্ত কেউ যুক্ত হতে পারেনি। সাম্প্রতি বাংলাদেশ বার কাউন্সিল পরীক্ষার রেজাল্ট প্রকাশিত হলে আইনজীবী হিসেবে সর্ব প্রথম এবং একমাত্র চাক সম্প্রদায় থেকে সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হয় এম এপ্রু চাক। রেজাল্ট প্রকাশিত হওয়ার পর পুরো বান্দরবানজুড়ে তার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।
এম এপ্রু চাক বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সদর ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ড চাক হেডম্যান পাড়ার ছানুঅং চাক ও মেদি চাক(মে) এর ছেলে।
এম এপ্রু চাক মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। চার ভাই এক বোনের মধ্যে বোন সবার বড় এবং ৪ ভাইয়ের সে মধ্যে ৩ নম্বর।
তার পড়ালেখার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক জীবন গ্রামে শেষ করে। পরে উচ্চ মাধ্যমিক বান্দরবান ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজে এবং আইন বিষয় পড়াশুনা চট্টগ্রামের প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি থেকে শেষ করে। সাম্প্রতি বার কাউন্সিল পরীক্ষায় সফলতার সাথে পাশ করে আইনজীবী হিসেবে বান্দরবান জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আইনচর্চা শুরু করে।
তার মামা নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা বাইশারী ইউনিয়নের হেডম্যান মংছানু চাক বলেন, ভাগিনা আমাদের চাক সম্প্রদায়ের গর্ব। দুর্গম এলাকা থেকে অনেক কষ্ট করে সে পড়াশুনা করেছে।
এ বিষয়ে এম এপ্রু চাক বলেন, আমার এই যাত্রা এতো সহজ ছিল না। খেয়ে না খেয়ে পড়াশুনা করেছি। জীবনে অনেক সংগ্রাম করেছি পড়াশুনা চালিয়ে যেতে। সৃষ্টিকর্তার কৃপায় এবং বাবা-মা, আত্মীয় স্বজনদের দোয়া এবং সহযোগিতায় এতোটুকু আসতে পেরেছি। নিজেকে সবার সেবাই বিলিয়ে দিতে চাই।
বান্দরবান জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারন সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবু জাফর বলেন, দেশের একমাত্র চাক সম্প্রদায় থেকে সেই এক মাত্র এবং সর্বপ্রথম আইনজীবী। এটি বান্দরবান জেলা আইনজীবী সমিতি তথা পুরো দেশের জন্য গর্বের বিষয়। আশা করছি সে চাক সম্প্রদায়সহ আইনসেবা প্রার্থীদের যথাযথ সেবা নিশ্চিত করবে।