জনসংখ্যায় শীর্ষে লামা, প্রতিনিধিত্বে শূন্য—কেন এই বৈষম্য?

হাবিব আল মাহমুদ
 ছবি:
ছবি:

বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের নতুন অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ গঠনের পর আবারও একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। প্রশ্নটি শুধু লামার নয়, প্রশ্নটি প্রতিনিধিত্বের। প্রশ্নটি হলো, জেলার সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠীর একটি উপজেলা কি জেলা পরিষদের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানে এতটাই গুরুত্বহীন যে সেখান থেকে একজন প্রতিনিধিও রাখা যায় না?
২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী বান্দরবান জেলার সবচেয়ে জনবহুল উপজেলা লামা। প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষের বসবাস এই উপজেলায়। জেলার মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৯ শতাংশ মানুষ লামায় বসবাস করেন। জনসংখ্যার দিক থেকে লামার অবস্থান সবার ওপরে। অথচ নতুন ১৫ সদস্যের জেলা পরিষদে লামা থেকে একজন প্রতিনিধিও রাখা হয়নি।
বিষয়টি আরও ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়ায় যখন দেখা যায়, জনসংখ্যায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বান্দরবান সদর থেকে একাই ৯ জন প্রতিনিধি রাখা হয়েছে। আলীকদম থেকে ২ জন, রোয়াংছড়ি থেকে ২ জন এবং রুমা থেকে ২ জন। অর্থাৎ ১৫ সদস্যের পরিষদে বান্দরবান সদর, আলীকদম, রোয়াংছড়ি ও রুমা প্রতিনিধিত্ব পেলেও জেলার সবচেয়ে জনবহুল উপজেলা লামা রয়ে গেছে সম্পূর্ণ প্রতিনিধিত্বহীন।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। অন্তর্বর্তীকালীন জেলা পরিষদে প্রতিটি উপজেলাকে জনসংখ্যার অনুপাতে প্রতিনিধি দিতে হবে, এমন কোনো সরাসরি আইন নেই। ফলে লামা থেকে প্রতিনিধি না থাকাকে সরাসরি আইনবিরোধী বলা ঠিক হবে না। কিন্তু আইনগত বাধ্যবাধকতা না থাকলেই কি ন্যায্য প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন তোলা যাবে না?
আমার মনে হয়, অবশ্যই যাবে।
কারণ জেলা পরিষদ শুধু একটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান নয়। পার্বত্য অঞ্চলের বাস্তবতায় এই পরিষদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়ন, স্থানীয় অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিষদের সিদ্ধান্ত মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে। সেই জায়গায় জেলার সবচেয়ে বড় জনসংখ্যার একটি উপজেলা থেকে কোনো কণ্ঠস্বর না থাকা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করে।
আর এই প্রশ্নটি একেবারে নতুনও নয়।
২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বান্দরবান জেলা পরিষদ পুনর্গঠন করা হয়েছিল। তখনও লামা থেকে কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি। সে সময় লামার বিভিন্ন মহল থেকে প্রকাশ্যে ক্ষোভ ও আপত্তি জানানো হয়েছিল।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ২০২৪ সালের পরিষদে নাইক্ষ্যংছড়ির প্রতিনিধিত্ব ছিল। অর্থাৎ সেই সময় লামা প্রতিনিধিত্বের বাইরে থাকলেও নাইক্ষ্যংছড়ি সম্পূর্ণভাবে বাদ পড়েনি। কিন্তু এবার নতুন পরিষদে লামার পাশাপাশি নাইক্ষ্যংছড়িও প্রতিনিধিত্বহীন।
অর্থাৎ একটি বিষয় এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সরকার পরিবর্তন হয়েছে, রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু লামার প্রতিনিধিত্বহীনতার বাস্তবতা পরিবর্তন হয়নি।
এবারের পরিষদে আরেকটি বিষয়ও বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো। বান্দরবানের হিন্দু জনগোষ্ঠীর কোনো প্রতিনিধিত্ব রাখা হয়নি। ১৫ সদস্যের প্রকাশিত তালিকায় হিন্দু জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নেই।
বান্দরবান ধর্ম ও জাতিগত বৈচিত্র্যের জেলা। এখানে বৌদ্ধ, মুসলিম, হিন্দু ও খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতিগত জনগোষ্ঠীর বসবাস। সরকারি জেলা তথ্যেও বান্দরবানে ৩৪টি হিন্দু মন্দিরের তথ্য রয়েছে।
তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং একটি বৃহৎ ধর্মীয় জনগোষ্ঠী যখন একই পরিষদে প্রতিনিধিত্বের বাইরে থাকে, তখন প্রশ্নটি কেবল একটি উপজেলার থাকে না। প্রশ্নটি হয়ে যায়, জেলা পরিষদ গঠনের সময় প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য কতটা গুরুত্ব পেয়েছে?
আমরা কেউই বলতে চাই না যে জনসংখ্যার অনুপাতে লামাকে নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন দিতেই হবে। আবার এটাও বলা হচ্ছে না যে সদর উপজেলা থেকে একাধিক প্রতিনিধি থাকা উচিত নয়। সদর জেলা প্রশাসনের কেন্দ্র, ফলে সেখান থেকে বেশি প্রতিনিধিত্ব থাকার বাস্তব কারণ থাকতেই পারে।
কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়।
প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষের লামা থেকে একজনও নয় কেন?
নাইক্ষ্যংছড়ির মতো প্রায় ৭৬ হাজার মানুষের একটি উপজেলা থেকেও এবার কেউ নয় কেন?
হিন্দু জনগোষ্ঠীর জন্য একজন প্রতিনিধিও কেন রাখা হলো না?
আর যদি লামা ও নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে যোগ্য ব্যক্তি না পাওয়ার বিষয়টি বলা হয়, তাহলে সেই যোগ্যতার মানদণ্ড কী ছিল?
সবচেয়ে কষ্টের জায়গাটি হয়তো এখানেই। রাজনৈতিক দলগুলো যখন নির্বাচনের মাঠে নামে, তখন বৃহৎ জনগোষ্ঠীর উপজেলা তাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বড় ভোটার, বড় জনসংখ্যা, বড় নির্বাচনী প্রভাব এসব হিসাব তখন খুব গুরুত্ব পায়। কিন্তু ক্ষমতার কাঠামো সাজানোর সময় সেই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব যদি গুরুত্ব না পায়, তাহলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন আসাটাই স্বাভাবিক।
তাহলে কি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর উপজেলা শুধু ক্ষমতায় আসার মোক্ষম মাধ্যম?
নাকি ক্ষমতা পরিচালনার ক্ষেত্রেও তাদের সমান মর্যাদা ও প্রতিনিধিত্ব থাকবে?
এই প্রশ্নটি কোনো নির্দিষ্ট দল, ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয়। এটি লামার মানুষের প্রশ্ন। এটি নাইক্ষ্যংছড়ির মানুষের প্রশ্ন। একই সঙ্গে এটি বান্দরবানের সামগ্রিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন।
নতুন পরিষদে যারা দায়িত্ব পেয়েছেন, তাদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা আমার উদ্দেশ্য নয়। বরং তাদের প্রতি প্রত্যাশা আরও বেশি। কারণ তারা শুধু নিজেদের এলাকার নয়, পুরো বান্দরবানের মানুষের জন্য কাজ করবেন।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, প্রতিনিধিত্ব শুধু একটি পদ নয়। একজন প্রতিনিধি মানে একটি এলাকার মানুষের কথা বলার সুযোগ, তাদের সমস্যা তুলে ধরার সুযোগ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা।
লামা সেই সুযোগ থেকে আবারও বঞ্চিত হলো।
আগামীতে যদি জেলা পরিষদ সত্যিকার অর্থে জনগণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে হয়, তাহলে শুধু কে কোন পদ পেলেন সেটি নয়, কে বাদ পড়লেন এবং কেন বাদ পড়লেন সেটিও আলোচনার বিষয় হতে হবে।
কারণ গণতন্ত্রের সৌন্দর্য শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের ক্ষমতায় নয়, বরং যারা সংখ্যায় বড়, যারা সংখ্যায় ছোট, যারা কেন্দ্রের কাছাকাছি এবং যারা প্রান্তে তাদের প্রত্যেকের কণ্ঠস্বর শোনা যাওয়ার মধ্যেই।
লামার মানুষ তাই প্রশ্ন করতেই পারে।
তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়- বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর উপজেলা লামা ও নাইক্ষ্যংছড়ি কি শুধুই ক্ষমতায় আসার মোক্ষম হাতিয়ার?? 

লেখক- 
হাবিব আল মাহমুদ
শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

বিষয়:

এলাকার খবর

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত